দেবীপক্ষ

ড: সুকান্ত ঘোষ

প্রতিটি দিনই তো দেবীপক্ষ ভাবতে ভালো লাগে –

কেবল সেই ভোরে ওঠা নিয়ে সূর্যের সাথে রাগারাগি

না হয় মাথার কাছে বাজুক চেনা সুর

আধোঘুমে গুন গুন

নিবিড় হয়ে এসে বাড়ি ফেরার প্রতীক্ষা

টেলারিং বৌদিকে বলা আছে পরে গেলেও দিয়ে দেবে ঠিক

শেষবেলার ট্রায়াঙ্গুলার পার্ক

কাঠের ঘরে থেকে দেখি কত দেবী উঁকি দেয়

কেউ বলে ঠিক, কেউ বলে সমুদ্রসবুজ রঙে তোমায় বেশী মানায়

দেবীপক্ষের শুরুও তো সেই সিঁড়িতেই 

প্রিন্ট নিয়ে রেখছো তো? বেশ বড় কবিতা

আগমনী ছবিটি এঁকে রাখা আছে নিতে ভুলো না

কিভাবে আটকাবে দেখে রাখোনি তো?

আগমনী গান কেবলই উপলক্ষ্য

লাল-সাদা রঙের সন্ধ্যে      

এক দেবী দেখবে অন্যকে

প্রতিটি দিনেই দেবীর নূপুর শুনতে পাই –  

প্রতিটি দিনই দেবীপক্ষ ভাবতে ভালো লাগে

তোমার জন্যে

-তোমার জন্যে মাঠে ময়দানে 

কাশফুল বাড়াবাড়ি –

তোমার জন্যে ঢাকের কাঠিতে

 মশগুল বারোয়ারী !

তোমার জন্যে ষষ্টি  পুজোতে

শরতের  আগমন 

তোমার জন্যে অসুর নিধনে 

দশভুজা আবাহন |

তোমার জন্যে সপ্তমী ভোর 

হাতে হাতে অঞ্জলি ,

তোমার জন্যে আলোয় সেজেছে 

রাজপথ কানা গালি |

তোমার জন্যে ধূপের আবেশে 

সন্ধি পুজোর পাঠ –

তোমার জন্যে নবমী  নিশিতে 

বিজয়ের ভাঙা হাট |

তোমার জন্যে অভিসারী মন 

নীলকণ্ঠের আগে –

তোমার জন্যে হৃদয় মাঝারে 

তব  ত্রিনয়ন জাগে!  

পুজোর কথা

ডঃ তারকরঞ্জন গুপ্ত

।।১।।

পুজো ঠিক কখন আসে? ঠিকঠাক জানি না। তবে ছোটবেলায়  সাত সকালে আধ ঘুমের মধ্যে মায়ের ঠান্ডা হাত ছুঁয়ে যেত কপাল, গাল ! কানে ঢাকের আওয়াজ ! পাড়ার প্যান্ডেল  থেকে নতুন একটা গন্ধ ভেসে ভেসে আসছে । চারিদিকে কি রকম একটা অন্য সুর, সাতসকালটা  একটু অন্য রকম.  মা বলতো আজ মহা ষষ্টি  । স্কুল নেই, ক্লাস নেই, মাও  যেন একটু অন্যরকম আজকে! কোনো পড়তে বসা নেই! কিন্তু অনেক অনেক কিছু আছে। ঢাকের ওই বোলে  সব কিছু একসঙ্গে শুরু হয়ে গেলো। নতুন শাড়ির গন্ধ। মা আজ অন্য রকম। একটু পরেই  মাসিমা চলে আসবে। “কি জামা পরে ঠাকুর দেখতে যাবে আজ  বাবু?” … বারান্দার নিচ থেকে শুনতে পাবো “বুড়ো  বাবু ? উঠে পড়ো ” মেসোমশাই দাঁড়িয়ে পড়েছেন ….. মা এসেছেন, মা অন্যরকম! এক মা হাত ভর্তি ফুল নিয়ে অন্য মায়ের অঞ্জলি দিচ্ছেন ! দুই মা দেখছেন একে অপরকে ! 

।।২।।

পুজো এলো !  IIT  র  হোস্টেল থেকে সব বন্ধুরা বাড়ি ফিরে যাচ্ছে! সারা ট্রেন মশগুল! প্ল্যানিং!  কোথায় দেখা হবে, কোথায় খাওয়া ! ট্রেন এর জানলায় আমি দেখতে দেখতে চলেছি উপচে পড়া কাশফুল ! বাড়ি ফিরে  ব্যাগ রেখেই এদিক ওদিক দেখা! মা কোথায় ? মামার বাড়ি গেছে। একটু পরেই ফিরে  আসবে। হাতে সময় বড়  কম ! প্রথম ফোন তার বাড়ির নাম্বারে

 ” বাড়ি ফিরেছি । এই মাত্রা।”

“ও  আচ্ছা! আমরা তো বিষ্ণুপুরে যাবো  আজকেই । ” বাবা মা ভাই ।”

“আচ্ছা ফিরে  এস, পরে  কথা হবে ” 

“ভালো আছো?” 

পুজোর সকাল  কি রকম মন খারাপ কর দিয়ে গেলো।” তার চোখ ভেসে উঠলো সামনে । দূর্গা মায়ের চোখের আড়ালে তার চোখ দেখলাম যেন ! মনে মনে আমিও  চাইলাম যেতে, কিন্তু পারলাম না ! কি করে কাটাবো বাকি চারদিন? ফোন নেই, কথা বলা নেই! অভিমানে শুরু হলো পুজো। প্রথম না পাবার কষ্ট !

।।৩।।

পুজো এসেছে ! কলকাতা থেকে মাসতুতো দাদার ফোন ” মা কে ICU  তে দিয়েছে ! অপারেশন তো ঠিক  হয়েছিল,  কিন্তু কি হলো বলতো ?” চোখের সামনে মায়ের মূর্তি আস্তে আস্তে জলছবি হয়ে গেলো । পুজোর শুরুর দিনে আর মন থাকলো না পুজোয় । অষ্টমী র  রাতে চলে গেলো বড়  মাসিমা ! জিজ্ঞেস করলে না তো ” আজ কি জামা পরে ঠাকুর দেখতে যাবে  ….?”  অষ্টমী তে আমার আরেক মা চলে গেলেন বিসর্জনে ! 

।।৪।।

পুজো শুরু ! “সোনামনি কে নিয়ে আজ ঠাকুর দেখতে যাবি  তো ?” মায়ের ফোন কলকাতা থেকে! 

“তুমি যাবে না মা?”

” নাহ  শরীর ভালো নেই।”

 “মায়ের কাছে একবার যাও , পাড়াতেই তো ঠাকুর ! শরীর ভালো হয়ে যাবে” । 

উত্তর এলো, আর তো কটা  দিন ! একেবারেই চলে যাবো ! 

দুই মা এক হয়ে গেলো একদিন! কাছে পাই না! ফোন করতে পারি না! কিন্তু বুঝতে পারি! মা আসেন! মা এসেছেন! আজ যে পুজো!  দূরে দাঁড়িয়ে দেখছি , দেখছি মায়ের অঞ্জলি  দেওয়া! 

।।৪।। 

পুজো শুরু আজ! সকালে মণ্ডপের নিচে দাঁড়িয়ে আছি! ছেলে  স্কুল থেকে পরীক্ষা দিয়ে ফিরবে ! অটো থেকে নেমে পড়লো সে! ” চল  ওপরে মা অপেক্ষা করছে  তোর জন্যে !”  সিঁড়ি দিয়ে ছেলের পাশাপাশি ওপরে উঠছি । ভাবলাম বলি “কোন মা, বললাম বুঝলি ?  আজ  মা  এসেছে ” … ভাবলাম না  থাক ।  আজ  তো সবার মা এসেছে। সব হারিয়ে যাওয়া মায়েরা  সব এসে গেছে ! আজ তো পুজো শুরু ! 

আমাদের কথা

সব পুজোর শুরুতেই একটা গল্প থাকে। আমা দের  ক্ষেত্রেও সেটা ব্যতিক্রম নয়! পুজোর সুতো বাঁধা শুরু হয়েছিল হরামাভু  আগারা  লেকের কাছে একটা  ছোট্ট রেস্টুরেন্টে আড্ডায়  বসে আমরা কয়েকজন মিলে । রবিবারের বিকেল গুলোতে প্ল্যানিং যত না হতো, তার থেকে অন্য আলোচনা, চা, কফির আর সিগারেট  নিয়ে সময় বরাদ্দ হতো বেশি।  আসলে আড্ডার পরে শেষ পর্যন্ত একটা জিনিসই স্থির হতো, সেটা হচ্ছে পরবর্তী আড্ডার তারিখ। চা , কফির  ব্যাপারটা খুব ইম্পর্টেন্ট , কারণ আমাদের  আড্ডার লোকজনের সংখ্যা বেড়ে যেত বিকেল থেকে সন্ধে গড়ানোর সঙ্গে সং আর কথাবার্তার ডেসিবেল প্রায় একশো পেরিয়েই যেত সময় সময়.! রেস্টুরেন্টে  কাউন্টারে বসা ছেলেটা বেশ সন্দেহজনক চোখে আমাদের দেখতে থাকতো!এরা  করা, কথা থেকে এসেছে, এতো হৈ  চৈ  কিসের, এগুলো বোঝার প্রানপণ  চেষ্টা করতো।  তাই  আবহাওয়া যাতে আমাদের কন্ট্রোলে থাকে, তার জন্যে আমরা মাঝে মাঝে দশ বারোটা  চা বা কফির অর্ডার দিতাম।.. একঘন্টা কেটে গেলে আবার  ওই একই অর্ডার রিপিট , যাতে বেমক্কা উঠিয়ে না দেয় ! এর মধ্যে বিশেষ ঘটনাগুলো হলো প্যাটেল দার  হাত ভাঙা, দেবোত্তম এর  পা ফ্র্যাকচার।  তাতে যদিও রবিবারের আড্ডার কোনও ব্যাঘাত  ঘটে নি ! অগাস্ট মাসে দেখা গেলো পুজো করতেই হবে , না হলে আর পারা  যাচ্ছে না।  এদিকে হাতে সময় বড়  কম।  পুজোর প্রাথমিক প্ল্যানিং শুরু হলো  , ম্যান -অভিমানের ধাক্কা কাটিয়ে ঘোষণা করে দেওয়া হলো “পুজো হচ্ছে “..

এসো সবাই!

আর দেরি নেই! পুজোর গন্ধ এসে এসে নাকে লাগছে!  শুধু  বাংলায় নয়, বেঙ্গালুরুতেও  মা আসছেন! সব্বাই তৈরী হয়ে নাও তাড়াতাড়ি!  আমাদের প্রথম প্রয়াস , প্রথম বছর !